👨🦱 নাগেশ্বরীর আপডেট নিউজ প্রতিবেদন 🔰প্রকাশ : ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:৩৭ পিএম
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও নাগেশ্বরী সংবাদদাতা:
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাহাবুর রহমান (২৪) নামে এক যুবককে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে সাজা দেওয়ার আগে ওই যুবককে স্থানীয় কয়েকজন খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেছেন—এমন অভিযোগ ও ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সাজা দেওয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন আইনজীবী।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাগেশ্বরী দয়াময়ী (ডিএম) পাইলট একাডেমিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাহাবুরকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বদরুজ্জামান রিশাদ।
সাজাপ্রাপ্ত মাহাবুর রহমান নাগেশ্বরী পৌরসভার গোদ্ধারের পাড় এলাকার ইছহাক আলীর ছেলে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কে এম আনিছুর রহমান জানান, সোমবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে আসার পথে কাজী মার্কেটের আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে মাহাবুরের বিরুদ্ধে। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহাবুরকে উদ্ধার করে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসা শেষে তাঁকে ডিএম একাডেমিতে নেওয়া হয়। পরে সেখানেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আটকের পর কয়েকজন যুবক মাহাবুরকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও মারধরে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাগেশ্বরী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় ওই যুবককে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে হাসপাতাল থেকে তাঁকে বিদ্যালয়ে নেওয়া হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়।
এদিকে মাহাবুরের পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন। তাঁর বড় ভাই মাইদুল ইসলাম বলেন, প্রায় চার বছর ধরে মাহাবুরের চিকিৎসা চলছে এবং তাঁদের কাছে চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, মাহাবুরকে আটকের পর মারধর করা হলেও তাঁর মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা শ্লীলতাহানির অভিযোগের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ঘটনার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীরা। তাঁদের মতে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, ঘটনাটি নিয়মিত মামলা করে তদন্তের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ায় নেওয়া উচিত ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মোবাইল কোর্ট আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংঘটিত বা তাঁর মাধ্যমে উদ্ঘাটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান রয়েছে। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং পরে সেখানে গিয়ে সাজা দেওয়ায় আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বদরুজ্জামান রিশাদ। তিনি বলেন, তাঁর সামনে অপরাধ সংঘটিত না হলেও তিনি ঘটনাটি উদ্ঘাটন করেছেন এবং বিষয়টি মোবাইল কোর্ট আইনের এখতিয়ারভুক্ত ছিল। স্কুলের সামনের ঘটনা হওয়ায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাহাবুরকে আটকের পর মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, তাঁকে মারধর করা হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।
ঘটনাটি নিয়ে একদিকে শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা, অন্যদিকে অভিযুক্তকে জনতার হাতে মারধরের অভিযোগ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেওয়া সাজার আইনগত বৈধতা—সব মিলিয়ে এলাকায় আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীর অভিযোগের পাশাপাশি অভিযুক্তকে আটকের পর মারধরের অভিযোগ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম—তিনটি বিষয়ই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট করা হবে।

0 Comments