👨🦱 নাগেশ্বরীর আপডেট নিউজ প্রতিবেদন 🔰প্রকাশ : ৩১ আগষ্ট ২০২৬, ৮:১০ এএম
(কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। এর মধ্যে দেখা দিয়েছে সার সংকট। তার ওপর ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কৃষক ও সাধারণ মানুষ। বিদ্যুতের অভাবে সেচযন্ত্র চালাতে না পারায় আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে প্রয়োজনীয় পানি দিতে পারছেন না কৃষকরা। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় ফসলের উৎপাদন নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।কৃষকদের অভিযোগ, দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেচের মোটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। রাতে বিদ্যুৎ এলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। ফলে সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পেরে অনেক ফসলি জমিতে মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি না হওয়া এবং প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমনসহ অন্যান্য ফসলের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাগেশ্বরী উপজেলায় বর্তমানে দিনের প্রায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে অনেক সময় মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় কৃষকরা সেচযন্ত্র চালানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় পাচ্ছেন না। এতে কৃষিকাজের পাশাপাশি শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনেও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।সেচ দিতে না পেরে দুশ্চিন্তায় কৃষকএ সময় আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় বৈদ্যুতিক মোটর চালাতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে অনেক জমিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।কৃষকরা বলছেন, বৃষ্টি না হওয়ায় এমনিতেই জমিতে পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড রোদে জমি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।নাগেশ্বরীর এক কৃষক বেলাল বলেন, “কারেন্ট নাই, বৃষ্টিও নাই, জমিতে পানি দিবো কিভাবে? এভাবে চলতে থাকলে সব ফসল মাঠেই মরে যাবে। আমরা এখন কোন দিকে যাই? আবার সারও পাচ্ছি না। সারের জন্য ডিলারের দোকান ও সারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও সার পাচ্ছি না। জমিতে প্রথমবার একবার সার দিয়েছি, এখন দ্বিতীয়বার আর সার পাচ্ছি না। তাহলে কী হবে আমাদের? এই ধান না হলে আমরা খাব কী?”কৃষকদের ভাষ্য, ফসল উৎপাদনের জন্য সেচ ও সার—দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুৎ ও সারের সংকট দেখা দেওয়ায় তারা দ্বিমুখী সমস্যায় পড়েছেন। সময়মতো জমিতে পানি ও সার দিতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।সার সংকটেও বিপাকে কৃষকবিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সার না পাওয়ার অভিযোগও করছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। কৃষকদের দাবি, প্রয়োজনের সময় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না।কৃষকদের অভিযোগ, আমন মৌসুমে জমিতে পর্যায়ক্রমে সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন হলেও দ্বিতীয় দফায় অনেকেই চাহিদামতো সার সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।তবে সার বিতরণে প্রকৃত পরিস্থিতি, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কৃষকদের দাবি, কৃষি মৌসুমে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং প্রকৃত কৃষকদের কাছে ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষশুধু কৃষক নয়, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নাগেশ্বরীর সাধারণ মানুষও। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। দোকানপাট ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।এ ছাড়া হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় লোডশেডিং: জোনাল অফিসভয়াবহ লোডশেডিংয়ের বিষয়ে নাগেশ্বরী জোনাল অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বর্তমানে নাগেশ্বরীর চাহিদার তুলনায় কয়েক মাস আগের তুলনায় কম মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সীমিত বিদ্যুৎ বিভিন্ন ফিডারে ভাগ করে সরবরাহ করতে হচ্ছে।জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি লাইন বন্ধ রেখে অন্য একটি লাইন চালু করতে হচ্ছে। ফলে কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হলে অন্য এলাকায় সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ কারণেই নাগেশ্বরীতে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে তারা জানান।তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছে নাগেশ্বরী জোনাল অফিস। বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হলে লোডশেডিংও কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চান কৃষকরাকৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বর্তমানে কৃষি মৌসুম চলছে। তাই অন্তত দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, দিনের বেলায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে সেচ কার্যক্রম অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।কৃষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সংকট এবং সারের ঘাটতি একসঙ্গে চলতে থাকলে এবার ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেলে তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।স্থানীয়দের মতে, কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, সেচের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং সার সরবরাহের সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।কৃষকরা বলছেন, “আমরা ফসল ফলিয়ে পরিবার চালাই। সময়মতো পানি, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ না পেলে আমাদের পুরো বছরের পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”এ অবস্থায় নাগেশ্বরীর কৃষি মৌসুমকে গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ ও সার সংকট দ্রুত নিরসন করা না হলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ওপর নয়, সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

0 Comments