👨🦱 নাগেশ্বরীর আপডেট নিউজ প্রতিবেদন 🔰প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
কুড়িগ্রামে পুলিশে চাকরি দেওয়ার নামে সাড়ে ৭ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, এনসিপির কয়েক নেতার নাম
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে পুলিশে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করে বিশেষ কোটায় চাকরি নিশ্চিত ও নিয়োগ পরীক্ষায় শতভাগ পাসের আশ্বাস দিয়ে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। এর মধ্যে তিন ধাপে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
অভিযোগের ঘটনায় ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব খলিলুর রহমান, কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল এবং নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনের নাম এসেছে। তবে অভিযোগের বিভিন্ন অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অস্বীকারও রয়েছে।
ভুক্তভোগী নাঈম ইসলামের ভগ্নিপতি হাফিজুর মিয়ার সঙ্গে খলিলুর রহমানের চুক্তি হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। সেখানে বিশেষ কোটায় পুলিশে চাকরি নিশ্চিত এবং নিয়োগ পরীক্ষায় শতভাগ পাসের আশ্বাস দেওয়া হয়। এ জন্য ১৬ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
হাফিজুর মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমান, মাহমুদুল হাসান জুয়েল ও আলমগীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিন ধাপে তাঁর কাছ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
হাফিজুর মিয়া বলেন, ‘এই তিনজনে কন্টাক্ট করে আমার কাছ থেকে তিন ধাপে সাড়ে সাত লাখ টাকা নিয়েছে।’
অভিযোগ অনুযায়ী, ফুলবাড়ী কাচারী মাঠসংলগ্ন একটি মসজিদের বারান্দায় ওই লেনদেনের একটি অংশ সম্পন্ন হয়। লেনদেনের সময় উভয় পক্ষের কাছ থেকে দুটি করে ব্যাংক চেক এবং ১০০ টাকার তিনটি ফাঁকা স্বাক্ষরিত স্ট্যাম্প জামানত হিসেবে রাখা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
ওই লেনদেনের সাক্ষী হিসেবে স্থানীয় ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সোহরাব হোসেনের নাম উঠে এসেছে।
সোহরাব হোসেন জানান, নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর তাকে ওই বৈঠকে বসানো হয়। তাঁর সামনে ২ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও তিনি জানান। এর আগে আরও ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানতে পারেন বলে দাবি তাঁর।
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর অংশে বলা হয়, টাকা দেওয়ার পর নাঈম ও হাফিজুরকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের দালালচক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন হাফিজুর।
তাঁর দাবি, কোনোভাবে সেখান থেকে পালিয়ে তাঁরা ফিরে আসেন। এ সময় নাঈমের এসএসসি ও এইচএসসির মূল সনদপত্র সেখানে থেকে যায়।
হাফিজুর মিয়ার ভাষ্য, তাঁদের গুম বা ক্ষতি করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরে নানা কৌশলে তাঁরা সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি; বিষয়টি ভুক্তভোগী পক্ষের বক্তব্য হিসেবে এসেছে।
ভুক্তভোগী নাঈম ইসলাম জানান, ঢাকায় রেখে আসা তাঁর এসএসসি ও এইচএসসির মূল সনদপত্র পরে কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল ঢাকায় গিয়ে উদ্ধার করে দেন।
নাঈম বলেন, ‘জুয়েল ঢাকায় গেছিল। জুয়েল ঢাকায় যাইয়া এই তিন-চার সপ্তাহ হয় এরকম সার্টিফিকেট আনি দিছে।’
চাকরি না হওয়ায় পরিবারটি টাকা ফেরতের জন্য চাপ দেয়। এরপর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানান নাঈম। তাঁর দাবি, এখনো ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে।
বকেয়া টাকা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব আজান আহমেদ শাওন দাবি করেন, খলিলুর রহমানের মতো আর্থিকভাবে অসচ্ছল একজন ব্যক্তির পক্ষে কারও সহযোগিতা বা ইন্ধন ছাড়া এত বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক নাজমুল ফেরদৌস লাবলু ও সদস্যসচিব আব্দুল লতিফের দিকে অভিযোগের ইঙ্গিত করেন। একই সঙ্গে জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল হোসেন ও সদস্যসচিব মাসুম মিয়ার সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানের সময় খলিলুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে কথা হয়। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাঁর ছেলে কাউসার আলী পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরে।
কাউসারের ভাষ্য, তাঁদের পরিবারে চরম অভাব-অনটন রয়েছে এবং অনেক সময় প্রয়োজনীয় খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থাও করা সম্ভব হয় না।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও খলিলুর রহমানের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানান। তাঁদের দাবি, তাঁকে দিনমজুরি করে পরিবার চালাতে দেখা যায়। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আগে এ ধরনের অভিযোগ তাঁরা দেখেননি বলেও জানান স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনের সঙ্গে কথা বলে অনুসন্ধানী দল। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনে তিনি ভুক্তভোগীদের ‘বাড়াবাড়ি’ না করার বিষয়ে সতর্ক করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আলমগীর হোসেন বলেন, বিষয়টি মীমাংসার জন্য মধ্যস্থতা করতে গিয়ে তিনি ২ লাখ টাকার একটি চেক দিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর লেখা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থ লেনদেনের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে উঠে এলেও, তিনি নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েলও লেনদেনের সময় উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক পর্যায়ে তিনি ৬ লাখ টাকা পরিশোধের বিষয়েও কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট অর্থের হিসাব প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ভুক্তভোগী নাঈম ইসলামের অভিযোগ, পুলিশে চাকরির আশ্বাস দেওয়ার সময় স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
নাঈম বলেন, তাঁকে বলা হয়েছিল সংসদ সদস্যের মাধ্যমে দুজনকে পুলিশে চাকরিতে ঢোকানো হবে। নির্বাচনের পরও এ বিষয়ে তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।
অভিযোগে কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদের নাম আসায় তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয়।
ড. আতিক মুজাহিদ জানান, তাঁর নাম ব্যবহার করে চাকরির জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেলে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।
এক ফোনালাপে তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
তবে পরে তিনি জানান, অভিযুক্তরা তাঁর নাম ব্যবহার করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
আতিক মুজাহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর নাম ব্যবহার করে চাকরির টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘চাকরির টাকা নিবে নাম কইরা আমার আবার?’
ড. আতিক মুজাহিদ ভুক্তভোগীদের বাকি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের একটি স্ক্রিনশট প্রতিবেদককে দেখান।
তবে ভুক্তভোগী নাঈম ইসলাম দাবি করেন, ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি কোনো টাকা পাননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সর্বশেষ টাকা পেয়েছেন ২ সেপ্টেম্বর।
নাঈম বলেন, ‘১৯ তারিখ কোনো টাকা দেয় নাই। ১৯ তারিখ কোনো টাকা পাইনি আমরা।’
ফলে টাকা ফেরতের সময় ও পরিমাণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
অনুসন্ধানের সময় ড. আতিক মুজাহিদ প্রতিবেদককে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার বিষয়ে বার্তা দেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে মতবিরোধের এক পর্যায়ে তিনি প্রতিবেদক ও তাঁর টিমের বিরুদ্ধে টাকা চাওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তবে প্রতিবেদক ওই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে।
অনুসন্ধানের সময় অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কুড়িগ্রাম জেলা শাখা ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব খলিলুর রহমান এবং নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনকে বহিষ্কার করে।
তবে বহিষ্কারের কারণ নিয়ে দলটির জেলা নেতৃত্বের বক্তব্য ভিন্ন।
কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল হোসেন দাবি করেন, চাকরি-সংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কারণে নয়, দলের অভ্যন্তরীণ অন্য কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি এমপি বা তাঁর নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মুকুল হোসেন বলেন, তাঁর সঙ্গে কিংবা সংসদ সদস্যের সঙ্গে এ ঘটনার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ‘শতভাগ অসত্য’। অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় একের পর এক প্রভাবশালী নেতার মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বাংলা এডিশনের প্রতিবেদক রবিউল ইসলাম। সাধারণ মানুষের সরলতা ও বেকারদের স্বপ্ন নিয়ে এই নির্মম প্রতারণার শেষ কোথায় এবং এর প্রকৃত বিচার হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

0 Comments